চিন্তার বিকাশ ও মেধার সন্ধান | child development stages
শিশুর মন কাদা মাটির মত, তাকে যা দেখাবেন, যা শেখাবেন সে তা-ই দেখবে ও শিখবে। এর বেশী নয়। আপনি নিশ্চয়ই চান আপনার সন্তানের একটি নিরাপদ ও আলোকিত ভবিষ্যত? আমাদের অনেকেরই ধারনা এরকম--ছেলে বা মেয়ে ভালো স্কুল/কলেজ/নামীদামী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভালো বিষয়ে পাশ করে ভালো রেজাল্ট করবে। তারপর ভালো একটা চাকরী পেলেই ব্যস দায়িত্ব শেষ। আসলেই কি তাই?
আজকের
লেখার মূল প্রতিপাদ্য হল শিশুর অন্তর্জগত কে খুলে দেয়া, বাইরের জগতের সাথে পরিচয়ের
মাধ্যমে। একাডেমিক শিক্ষার পাশাপাশি এমন অনেক বিষয় আছে যেগুলো আপনার সন্তানের
চিন্তা শক্তির প্রসারে অনেক বড় ভূমিকা রাখতে পারে। চলুন এ বিষয়ে আলোকপাত করা যাক।
১।প্রকৃতির সাথে পরিচয়ঃ আপনার সন্তানকে আমাদের আশেপাশের ফুল, পাখী,বিভিন্ন গাছ,পুকুর বা আকুরিয়ামের মাছ,চেনানো শুরু করুন। প্রতিদিন নিয়ম করে তার সাথে গল্প করে করে আশেপাশের পরিবেশের সাথে পরিচিত করান। ঘরে পোষতে পারেন কবুতর, টিয়া, বিড়াল,খরগোশ ইত্যাদি। পশু-পাখিদের প্রতি মমতা, তাদের সঙ্গে খেলা— তাকে সুন্দর মনের অধিকারী করে তুলবে। সেই সাথে দেখুন এর মধ্যে কোন বিষয়ে সে বেশী আগ্রহ দেখায়। তার ভালো লাগাটা খুঁজে বের করুন। তার ভালো লাগাটা হয়ত তাকে একদিন অনেক বড় “প্রকৃতি বিশারদ” করে তুলবে।
২। ছবি আঁকা/ছবি তোলাঃ ছবি আঁকার মাধ্যমে শিশুর কল্পনাশক্তি বাড়ে। সে যদি ছবি আঁকতে ভালোবাসে তবে সেটা কখনও না কখন প্রকাশ পাবেই। আবার ছবি তোলাও একটি ভালো গুন হতে পারে। হয়ত সে আপনার মোবাইল দিয়ে ছবি তুলতে চাইছে কিন্তু আপনি এটাকে অত টা গুরুত্ব দিচ্ছেন না। তাকে বরং উৎসাহ দিন। প্রকৃতির ছবি,নদী, সাগর, পাহাড় ইত্যাদির ছবি তুলতে তাকে আগ্রহ দেখান।
৩।গান শেখা/শোনাঃ আপনার সন্তান সুন্দর মার্জিত গান শুনতে পছন্দ করে? গুনগুন করে গাইতে চেষ্টা করে? খেয়াল করুন। তার আগ্রহের মর্যাদা দিন। নির্দিষ্ট বয়সে নাম লিখিয়ে নিতে পারেন গানের স্কুলে।
৪। নাচ শেখাঃ মেয়ে হলে তাকে নাচের প্রতি আগ্রহী করে তুলতে পারেন।যদি দেখেন আপনার মেয়ে নাচ দেখে আনন্দিত হচ্ছে, টিভিতে নাচ দেখে তাল মেলাচ্ছে অথবা শিখতে চাইছে, নির্দ্বিধায় নাচের স্কুলে ভর্তি করে দেন।
৫।খেলাধূলাঃ ছেলে হয়ত বিশেষ কোন খেলার প্রতি হয়ত দূর্বল যেমনঃ ক্রিকেট, ফুটবল বা বাস্কেট বল। দয়া করে বিরক্ত হবেন না। দেখুন ওর ভালোবাসার খেলা কোনটা,সুযোগ থাকলে তাকে দরকারী আয়োজন করে দিন। উৎসাহ দিন। সে ও হতে পারে আগামীর “তামিম” বা “সাকিব”।
৬। ভ্রমন করাঃ খেয়াল করেছেন হয়ত,সফরের সময় মন থাকে প্রসন্ন,আর এ সময় সহজেই আশেপাশের মানুষের সাথে সখ্যতা গড়ে উঠে। অবসর পেলেই বেরিয়ে পড়ুন বাচ্চাদের নিয়ে। ভ্রমন মানেই বিদেশ যেতে হবে এমন কোন কথা নয়। হয়ত আপনার আশেপাশেই আছে বিখ্যাত কোন স্থাপনা বা ঐতিহাসিক কীর্তি।তবে উদ্দেশ্য স্রেফ ঘুরাঘুরি নয়। ছেলে/মেয়ে যেন কিছু শিখতে পারে। উদাহরন স্বরুপ বিভিন্ন যাদুঘর, মোঘল স্থাপনা,সাফারি পার্ক,ঐতিহাসিক স্থান, কোন বিখ্যাত ব্যক্তির জন্মস্থান ইত্যাদি। যাবার আগে ঐ স্থান সম্বন্ধে একটু জেনে নিবেন। ভ্রমনে শুধু জ্ঞানই বাড়েনা, মন ও উদার হয়।আর কিছু না হোক এই গুনগুলো সন্তানের ভিতর জেগে উঠবে সন্দেহ নেই।
৭। বাগান করাঃ আপনার ঘরের সামনে এক টুকরো বাগান আছে? বাচ্চাকে নিয়ে মাঝে মাঝে নেমে পড়তে পারেন। ফুলের গাছ রোপন,আগাছা পরিষ্কার, পানি দেয়া এসব কাজে ছেলে বা মেয়েকে উৎসাহিত করুন। ফুল,গাছের পরির্চযা আপনার বাচ্চাকে প্রফুল্ল রাখবে। প্রকৃতির সাথে সন্তানকে পরিচয় করিয়ে দেয়ার এটি আরেকটি চমৎকার মাধ্যম।
৮।মহাকাশ ও সৌরজগতঃ মাথার উপর বিশাল আকাশটাকে পরিচয় করিয়ে দিন সন্তানকে। চিনিয়ে দিতে পারেন বিভিন্ন সৌরজগতের গ্রহ উপগ্রহ—গল্পের ছলে। সন্ধ্যার পর ছাদে বসে সৃষ্টি রহস্য নিয়েও গল্প করতে পারেন বাচ্চাদের সাথে। কে জানে,আপনার সন্তান ও হতে পারে ভবিষ্যতের এস্ট্রোনট !
৯। দাবা খেলাঃ সন্তানের আগ্রহ
থাকলে তাকে দাবা শেখাতে পারেন। দাবা এমন এক খেলা, যা শিখতে হলে ধীর-স্থির ও
বুদ্ধিমান হতে হয়। স্মৃতিশক্তি বৃদ্ধি (children brain development) পায় ও একাগ্রতা আসে।
সতর্কতাঃ
১।শিশুকে
যতটা সম্ভব মোবাইল, ট্যাব ইত্যাদি থেকে দূরে রাখতে হবে। এসব শিশুর মেধা ও মানসিক বিকাশে (child emotional development) ব্যাপক বাধা সৃষ্টি করে।
৫। বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, মেলা বা
শিক্ষামূলক প্রোগ্রামে বাচ্চাকে নিয়ে যান। অন্যদের সাথে মেশার সুযোগ করে দিন
সন্তানকে। নামতা’র মত (যেটি সারাজীবনই কাজে লাগে), মানুষের সাথে মেশার
ক্ষমতা তাকে সারা জীবন পথ দেখাবে।
মনে রাখবেনঃ
আপনার শিশুর কমপক্ষে এমন একটি গুন থাকা উচিত যেটি
সে ভালোবাসে ও সারা জীবন ধরে রাখতে পারবে। তবে সেটি যেন ভালো কিছু হয়, অন্যের জন্য
ক্ষতি কারক না হয়। মানুষ যেন বলে “দারুন ত !”। যেমন
ধরুন, দ্রুত “রুবিকিউ”
মেলানো, ম্যাজিক দেখানো ইত্যাদি ।
এই লেখার মূল উদ্দেশ্য ছিল আপনার সন্তানের মেধাকে ভেতর থেকে বের করে আনা,যাতে সেটি শাখা-প্রশাখা মেলতে পারে, উদ্ভাসিত হওয়ার সুযোগ পায়। আর সে জন্য সন্তানকে পর্যবেক্ষন করতে হবে গভীর ভাবে। উপরে উল্লেখিত প্রতিটি বিষয়ই গুরুত্বপূর্ন ও আপনার সন্তানের জীবন বদলে দেয়ার জন্য যথেষ্ঠ। এমন আরো অনেক বিষয় আছে যা এখানে উল্লেখ করা হয়নি কিন্তু হয়ত আপনার বাচ্চার কোন পছন্দের বিষয়। সেটি আপনাকেই খুঁজে বের করতে হবে।


কোন মন্তব্য নেই
If you have any doubts please let me know