সন্তানকে গল্প শোনান | Storytelling for children
একটা সময় ছিল,যখন বাবা মা, দাদা, দাদু’রা শিশুদের গল্প শোনাতেন ঘুম পাড়াবার জন্য, বা শ্রেফ মনোরঞ্জনের জন্য। এখন মোবাইল,টিভির দাপটে ওসব বলতে গেলে উঠেই গেছে। আজকাল অভিভাবকরা শিশুদের টিভিতে দেখিয়ে বা তার স্মার্টফোনে প্রিয় কার্টুনটি ছেড়ে দিয়ে ব্যস্ত রাখতে বেশী স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। এভাবে প্রযুক্তি আমাদের দৈনন্দিন জীবনে বিরুপ প্রভাব ফেলছে অথচ,এই প্রযুক্তির মাধ্যমেই শিশুকে গল্প শোনানোর অভ্যাস করা যেতে পারে। যেমন, আপনার স্মার্টফোন থেকে নামিয়ে নিতে পারেন কিছু গল্প আর শোনাতে পারেন আপনার সন্তানকে।
শিশুর মানসিক বিকাশে গল্প এক অসাধারন ভূমিকা রাখতে পারে। আপনার শিশুর বয়স যদি ৩-১০ বছর হয়, তবে তাকে গল্প পড়ে শুনান (storytelling for kids) বা নিজে নিজে গল্পের বই পড়ায় অভ্যস্ত করে তুলুন। হয়ত এটা করতে অনেকটা সময় লাগবে, কিন্তু এর প্রভাব থেকে যাবে সারা জীবন। কি লাভ হবে তাতে?
আসুন জেনে নেই কিভাবে গল্প শোনাবেন এবং শিশুদের গল্প শুনানোর কিছু উপকারিতাঃ
কল্পনাশক্তি বৃদ্ধিঃ এটি এমন এক শক্তি, যেটি আপনার শিশুকে কল্পনা করতে শেখাবে,স্বপ্ন দেখতে শেখাবে। আপনার গল্পটি এমন হওয়া উচিত যা থেকে সন্তান কিছু শিখতে পারে। যেমন বিখ্যাত কোন ব্যক্তির গল্প,নবীদের গল্প কিংবা কারো সফলতার গল্প। অযথা বাঘ,সিংহ বা ভয়ের গল্প শোনাবেন না।
সৎগুণের বিকাশঃ আপনার গল্পের শেষ ভাগে একটি অর্থপূর্ণ মেসেজ বা উক্তি রাখতে পারেন। আপনার শিশুর মনে বুদ্ধি, সততা,সৎ চরিত্রের বিকাশে সাহায্য করবে।
শোনার দক্ষতা বৃদ্ধিঃ আপনি যখন শিশুকে গল্প শুনাবেন (storytelling for kids), ধীরে ধীরে তার মধ্যে শোনার আগ্রহএবং শুনে বোঝার চেষ্টা বাড়বে। মনোযোগী হওয়ার প্রবণতাও বাড়বে। আর বলাই বাহূল্য,আপনার সাথে সন্তানের সম্পর্কটা আর ও মজবুত হবে।
স্মৃতিশক্তি প্রসারিত হয়ঃ একটি গল্প শুনানোর পরে আপনার সন্তানকে খুটিনাটি প্রশ্ন করুন,দেখুন সে উত্তর দিতে পারে কি না। ভুল হলে শুধরে দিন। পরের দিন তাকেই বলুন গল্পটা শোনাতে। এতে করে আপনার শিশুর স্মৃতিশক্তি ভীষন ভাবে প্রভাবিত হবে। মনোযোগ ও বাড়বে।
যোগাযোগের দক্ষতা বৃদ্ধিঃ স্টোরিটেলিং বা গল্পবলা (storytelling for children) শিশুর মধ্যে সঠিক প্রশ্ন করার ক্ষমতা তৈরি করে দেয়। আত্ম বিশ্বাস বাড়ায়। অন্যের সাথে কথোপকথনে জড়তা কেটে যায়। তাকে দিয়ে নিয়মিত গল্প বলালে আপনার শিশু ভবিষ্যতে একজন ভালো বক্তা হয়ে ও উঠতে পারে।
পড়াশুনায় সাবলীলতাঃ মুখস্ত না করে বুঝে পড়ার অভ্যাস গড়ে তোলার জন্য গল্পের জুড়ি নেই। গল্পের বই পড়ার অভ্যাস থাকলে সে ছোটবেলা থেকেই বুঝে শেখার চেষ্টা করবে। আপনি পাঠ্যসূচির বিষয় গুলোকে ও গল্পের আকারে উপস্থাপন করতে পারেন। এতে সন্তান হেসে খেলে আনন্দে শিখবে। তার কাছে মোটে ও চাপ মনে হবে না।
ইতিহাস,সংস্কৃতি সম্পর্কে জ্ঞানঃ আমাদের মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতার ইতিহাস,ভাষার গল্প- এ সব এই প্রজন্মের কাছে একদম অজানা। গল্পে গল্পে আপ নার শিশুকে জানাতে পারেন ভাষা শহীদদের কাহিনী কিংবা যুদ্ধে করে যারা প্রাণ বিসর্জন দিয়েছেন তাঁদের কথা। দেশের জন্য ভালোবাসা সন্তানের মনে এভাবেই গেঁথে দিতে পারেন।
ভাষার দক্ষতা বৃদ্ধিঃ গল্পে গল্পে আপনার সন্তান কে নতুন নতুন শব্দ এবং তাদের উচ্চারণ ও শিখিয়ে ফেলতে পারেন। পরে আবার জিজ্ঞেস করুন। প্রতিনিয়ত এই চর্চা শিশুর ভাষা, ছন্দ, অক্ষরজ্ঞান বিকাশে সহায়তা করবে।
কী বই কিনবেনঃ বিখ্যাত ব্যক্তিদের জীবনী,আবিস্কারের কাহিনী,বিভিন্ন দেশ ও সংস্কৃতি নিয়ে গল্প,মুক্তিযুদ্ধ বা স্বাধীনতার গল্প, নৈতিক গল্প মানে--যে গল্পে অন্যের উপকার করা, দরিদ্রকে সাহায্য করা, মানুষের সেবা করা,অন্যকে সম্মান করা ইত্যাদি ফুটে উঠে। রাক্ষস-খোক্কস, দৈত্য-দানো,পরী, রাজকন্যা,ঠাকুমার ঝুলি, গোপাল ভাঁড়, ভূত-পেত্নী—এসব একদমই কিনবেন না।
মনে রাখবেনঃ গল্প (baby storytelling) বলার সময় টিভি, কম্পিউটার সব বন্ধ রাখুন, যাতে শিশু মনোযোগ দিয়ে আপনার কথা শুনতে পারে। রাতে শিশুকে ঘুম পাড়ানোর জন্য ও গল্পের (moral stories for kids) আশ্রয় নিতে পারেন। তবে স্কুলের পড়াটা শেষ করেই যেন গল্প শুনতে বসে। তবে পড়া শেষ করার টানটা ও থাকবে।

কোন মন্তব্য নেই
If you have any doubts please let me know